মে দিবস ও একুশের ভাবনা
আজ
শনিবার। ১ মে, ২০২১। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এক
ভয়াবহ মে দিবসের সম্মুখিন পুরো বিশ্ব। বিগত দেড় বছর ধরে শ্রমিকরা তো বটেই, পুরো মানবজাতি আজ ঘরবন্দী।
এইতো সকালেই বাংলাদেশের স্বনামধন্য এক পত্রিকায়
মন্টু মিয়ার ছবি খুব বড় করে ছাপা হয়। মাথায় গামছা, চোখে হাত। সকাল থেকে কাজের আশায় শান্তিনগর
বাজারে বসে ছিলেন। নাহ, আজ কোনো কাজ নেই। লকডাউন, চারদিকে মানুষ এক কঠিন সময়
পার করছেন। অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও লকডাউন দিলেও এই শ্রমজীবি মানুষরা পরেছেন
বিপাকে। তাদের দিন এনে দিন খাওয়া তে যে ভাটা পরলো! এই ক্ষতি মন্টু মিয়ারা কিভাবে
পোষাবেন?
অথচ
শোষণ থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশ থেকে সুদূর আমেরিকার শিকাগো শহরে ১৮৮৬ সালে এক
হয়েছিলেন হে মার্কেটের সকল শ্রমিক। বুকের রক্ত ঝরিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সকল
শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। দাবী ছিলো আট ঘন্টার চেয়ে
এক মিনিটও কাজ না করার। দাবী
ছিলো তাদের প্রাপ্য ঠিকমত আদায় করে দেওয়ার। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই
প্যারিসে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন’ এ মে মাসের এক তারিখকে আন্তর্জাতিক
‘শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
অথচ এখন যে অনেক দেশের শ্রমিকদের কাজই নেই! বর্তমান
মে দিবস নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের পুরো প্রসেসটাকে দুই ভাগে ভাগ করে নিতে হবে।
কোভিড পুর্ববর্তী ও কোভিড পরবর্তী সময়।
মে দিবসের গুরুত্ব বুঝার জন্য কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা অতীব
জরুরী। প্রায় দেড়শ বছর আগে কার্ল মার্ক্স তাঁর ‘ক্যাপিটাল’ বইতে লিখে গেছেন
শ্রমিকদের মূল্য কত হওয়া উচিত। আদৌ কি শ্রমিকরা ভালো আছেন? তখন
বিলাতে ছিলো শিল্প বিপ্লবের যুগ। শিল্পপতিরা বিশ্বাসী ‘মুনাফা বাড়াও’ নীতিতে।
শ্রমিকদের কি হলো তাতে কিছু এসে যায় না। একজন শ্রমিক তাঁর আট ঘন্টা শ্রমের বিনিময়ে
যে পণ্য উৎপাদন করেন তাঁর ভ্যালু সেই পণ্য উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ
সেটা হয়ে যাচ্ছে সারপ্লাস ভ্যালু। দামের এই বাড়তি অংশটাই মালিকের পাওনা। এটা
মালিকের লাভ। কিন্তু শ্রমিকরা তাদের আট
ঘন্টা কাজের বিনিময়ে প্রাপ্য মূল্য পান না। কার্ল
মার্ক্স দেখিয়ে দিলেন শ্রমিকদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় ব্যয়
মোটামুটি বাজারদর অনুযায়ী মজুরি হিসেবে দেওয়ার পরও মালিকের মুনাফা বেশ ভালোই থাকে। তিনি আরও
দেখালেন যে, এই শ্রমিকরা যদি ভালো মত
মজুরি না পায় তাহলে এরা বাঁচবে না। এরা না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। দেড়শত বছর আগেই যেটা
কার্ল মার্ক্স বুঝেছিলেন সেটা ১৮৮৬ সালে আন্দোলনের পরেও আজকে অনেকেই বুঝতে চান না। সারপ্লাস
ভ্যালু ক্রমাগত বাড়ছে যেটা মালিক থেকে মালিক হিসাবে বেড়েই চলেছে। এই যে
ক্যাপিটালিস্ট মনোভাব সেটা আজও বহাল রয়েই গিয়েছে।
আপনি যদি উন্নত বিশ্বেও তাকান সেখানেও এখনো অনেক দেশের
শ্রমিজীবী
মানুষেরা বিক্ষোভ
করে যাচ্ছেন এই একই দিনে। কেনো এই বিক্ষোভ? প্রশ্ন তো রয়েই যায় আমরা
কি শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ,
আমাদের
মনোভাব,
আচরণ
এগুলো ঠিক করতে পেরেছি?
কিংবা
সঠিক মজুরী দিতে পেরেছি?
এই
খবর নিশ্চিত যতদিন হবে না ততদিন মে দিবসের তাৎপর্য পূর্ণতা পাবে না। বাংলাদেশের মত
উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে তাকালে তো আরও বেহাল দশা চোখে পরে। এইযে জাহাজ নির্মাণ
শিল্প,
ভবন
নির্মাণ শিল্প সহ এই কাজগুলা যারা করেন তাদের কাজের কি কোনো নির্দিষ্ট সময় সীমা
আছে? এদেরকে
কি সঠিক নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে? অনেকে দেখা যায় অধিক আয়ের আশায় এক্সট্রা সময় দিচ্ছেন কাজে। এতে
করে শারীরিক,
মানসিক
বা পারিবারিক সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে সমস্যা। স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে ধরা হয়
সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা কাজ। কিন্তু সম্প্রতি এটিকে কমিয়ে ৪০ ঘন্টা করারও চিন্তা ভাবনা
চলছে। দেশ থেকে দেশ এটি যদিও এটি পরিবর্তিত হয় তবুও অনেকেই ওভারটাইম কাজ করছেন যার
ফলে নানা ধরণের সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
তবে সেই হাওয়ায় পাল লাগালো করোনা নামক মহামারী। কোভিড
পূর্ববর্তী সময়ে যাও চলে গিয়েছিলো সেটিতেও ভাঁটা পরলো এই করোনা নামক মহামারী আসায়।
রোজ যতটুকুই কাজ ছিলো আজ সেটিও থাকছে না। আবারও ঘুরে আসা যাক কার্ল মার্ক্সের
কথায়। পুরো পৃথিবী পুঁজিবাদের গ্যাঁড়াকলে পরে আজ দুই ভাগে
বিভক্ত। খেটে খাওয়া মানুষগুলোর আজ হাহাকার চারিদিকে। মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোও
মোটামুটি চলে যাচ্ছে কোনো রকম কিন্তু যারা দিন আনতেন দিন খেতেন তাদের তো জীবন আর
চলে না। তবে হ্যাঁ বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাদের সহযোগীতা করা হলেও কতজনই বা পাচ্ছেন
এই সুবিধা সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কিংবা তাদের নিরাপত্তার কথাও তো চিন্তা করা
লাগবে আমাদের। এখনি যদি এই খেঁটে খাওয়া শ্রমিকদের দেখভাল না করা হয় তাহলে আসছে
দিনে চরম সংকট দেখা দিবে। সে সংকট কাটিয়ে উঠতে লেগে যাবে অনেক দিন।
গত ৩০ এপ্রিলের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার
নমপেন শহরে ১০০ জন শ্রমিক খাদ্যের জন্য আন্দোলন করেন। এমনকি
সেখানকার পাঁচশত ফ্যাক্টরীতে কাজ করা পাঁচ লাখ গার্মেন্টস কর্মী হতাশ এই লকডাউনে।
তাদের কোনো কাজ নেই। ফ্যাক্টরী বন্ধ। ওখানকার ৬৮% শ্রমিক জানিয়েছেন মহামারীর ফলে
তাদের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। ৫৫% শ্রমিক জানাচ্ছেন অর্থাভাবে তারা তাদের
চাহিদার থেকেও কম খাদ্য পেয়েছেন। এমনকি বাংলাদেশের কথাও যদি বলা হয় সেখানেও বহু
শ্রমজীবি মানুষের বেতন ভাতা আদায় করা হয়নি এখনো। ভারতে স্পিনিং
মিলগুলো জানাচ্ছে এই মহামারীতে তাদের কর্মী ছাটাই করা লেগেছে ১৫-২০% এর মত। এমনকি
বাইরের দেশ থেকে আসা বহু শ্রমিক কাজ ছেড়ে নিজ দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এমন কতশত উদাহরণ
রয়েছে। শুধু ভারত, বাংলাদেশ কিংবা কম্বোডিয়া
কেনো এই প্যান্ডেমিকের কারণে পুরো বিশ্বেই শ্রমিকরা খুব বেশি অবহেলিত হচ্ছেন। এই
করোনা মহামারীটি আজকের এই মে দিবসকে এক অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারী মাসে আইএলও অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যার প্রতিপাদ্য ছিলো ‘দ্যা রোল অফ ডিজিটাল লেবার প্লাটফর্মস ইন ট্রান্সফর্মিং দ্যা ওয়ার্ল্ড অফ ওয়ার্ক’। অর্থাৎ বর্তমান সময়ের কাজগুলো ডিজিটাল প্লাটফর্মে যে ট্রান্সফর্ম হচ্ছে তাঁর বিভিন্ন দিক্বিদিক। কোভিড ১৯ এর ফলে এই ডিজিটাল ওয়ার্কগুলো আরও বেড়ে গিয়েছে। এখন বাসায় বসেই অফিস করা যাচ্ছে, সব কাজই প্রায় করা যাচ্ছে। সেটি অবশ্যই ভালো দিক। কিন্তু যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন, যাদের শিক্ষার হার খুবই নগণ্য তারা কি আদৌ বেনেফিট পাচ্ছেন? তাদের কি কম্পেনসেশন দেওয়া হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো আজ এই মহান মে দিবস-২০২১ এ রয়েই যাচ্ছে!
Comments
Post a Comment